বাংলাদেশের ইতিহাসে কিছু ঘটনা আছে, যা প্রকৃতি ও রাজনীতির সংমিশ্রণে এক অবিশ্বাস্য মোড় এনে দিয়েছিল। ১৯৭০ সালের নভেম্বরে সংঘটিত ভয়াল ভোলা ঘূর্ণিঝড় ছিল তেমনই একটি ঘটনা—যে ঝড় কেবল লক্ষাধিক প্রাণ কেড়ে নেয়নি, বরং জাগিয়ে তুলেছিল স্বাধীনতার অদম্য আকাঙ্ক্ষা। প্রকৃতির সেই ক্রোধই এক অর্থে রূপ নিয়েছিল রাজনীতির জাগরণে। আজ অর্ধশতাব্দী পরে বাংলাদেশের বর্তমান অস্থির বাস্তবতায় অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—আবার কি এক ‘ঘূর্ণিঝড়ের’ প্রয়োজন? তবে এবার প্রকৃতির নয়, নৈতিক ও সামাজিক জাগরণের।
ভয়াল ভোলা: প্রকৃতির এক মৃত্যুবাণ
১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর, গভীর রাতে বঙ্গোপসাগর থেকে উঠে আসে এক ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়—ভোলা সাইক্লোন। বাতাসের বেগ ঘণ্টায় ২২৪ কিলোমিটার, সাথে ২০ ফুটেরও বেশি জলোচ্ছ্বাস। মুহূর্তেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় অঞ্চল ভেসে যায়।
মনপুরা, হাতিয়া, চর ফ্যাশন, ভোলার বিস্তীর্ণ ভূমি পরিণত হয় লাশের উপত্যকায়।
ব্রিটিশ পত্রিকা The Guardian-এর সাংবাদিক হাওয়ার্ড হোয়াইটম্যান লিখেছিলেন,
“মনপুরায় আমি শুধু মৃতদেহই দেখেছি—মানুষ, গবাদিপশু, ভেসে থাকা নৌকা—সবকিছুই নিস্তব্ধ। যেন প্রকৃতি নিজেই শোক করছে।”
আনুমানিক ৩ থেকে ৫ লক্ষ ১০ মানুষ, কোনো কোনো সূত্রমতে ১০ লক্ষ মানুষ মারা যায় সেই ঘুর্ণিঝড়ে। অসংখ্য পরিবার চিরতরে হারিয়ে যায়। জলবাহিত রোগ, ক্ষুধা, দুর্ভিক্ষ ও ত্রাণহীনতার অভিশাপে বেঁচে যাওয়া মানুষগুলোও মৃত্যু কামনা করেছিল।
পশ্চিম পাকিস্তানের উদাসীনতা: স্বাধীনতার বীজ
কিন্তু এই বিপর্যয়ের চেয়েও ভয়াবহ ছিল মানবিক উদাসীনতা। তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তখন চীন সফরে। ঘূর্ণিঝড়ের খবর পেয়েও তিনি তৎক্ষণাৎ কোনো প্রতিক্রিয়াই ব্যক্ত করলেন না, কোনো ব্যবস্থয়াও নিলেন না। চীন সফর শেষে ফিরে এসেও দুর্গত এলাকা পরিদর্শনে আসেননি ইয়াহিয়া খান। দুই সপ্তাহ পরে ২৬ নভেম্বর, তিনি সি-প্লেনে করে উপকূলের আকাশে চক্কর দিয়ে চলে যান। মাটিতে নামেননি। পরে সাংবাদিকদের বলেন—
“সরকারের কাজ নিয়ে আমি সন্তুষ্ট।”
এই মন্তব্যই পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের হৃদয়ে গেঁথে যায় অবিশ্বাসের ছুরি হয়ে। মানুষের মনে জন্ম নেয় প্রশ্ন—যদি আমরা নিজেদের রাষ্ট্র হতাম, তবে কি এমন অবহেলা হতো?
সেই প্রশ্নের উত্তরে জন্ম নেয় এক অগ্নিগর্ভ রাজনীতি।
প্রকৃতির ঝড় থেকে রাজনৈতিক ঝড়
ভোলার মাত্র এক মাস পরেই ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন।
এই নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ১৬৯টির মধ্যে ১৬৭টি আসনে জয়লাভ করে।
পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের ক্ষোভ, বেদনা, এবং উপেক্ষার প্রতিটি সুর যেন ভোটবাক্সে ঝড়ে পরিণত হয়েছিল।
ভোলা ঘূর্ণিঝড় তাই কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল না—এটি ছিল স্বাধীনতার ঘূর্ণিঝড়।
একটি ঝড়ের ভিতর দিয়েই জন্ম নেয় এক নতুন জাতি, এক নতুন মানচিত্র—বাংলাদেশ।
প্রকৃতির মতোই আজ দরকার এক সামাজিক ঝড়
আজ ৫৫ বছর পর বাংলাদেশ আবারও এক নীরব ঝড়ের মুখে দাঁড়িয়ে আছে—তবে এবার সেটা প্রকৃতির নয়, চেতনা ও মূল্যবোধের সংকট।
রাজনৈতিক বিভাজন, প্রশাসনিক অব্যবস্থা, ক্ষমতার লোভ, আর নৈতিক অবক্ষয়ের জোয়ারে সমাজের মানবিক ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।
যেভাবে তখন ইয়াহিয়ার উদাসীনতা বাঙালিকে স্বাধীনতার পথে ঠেলে দিয়েছিল, আজ তেমনি অবিচার, স্বজনপ্রীতি ও মিথ্যাচার মানুষকে সত্যিকার স্বাধীনতা—অর্থাৎ ন্যায়ের ও শান্তির সমাজের জন্য তৃষ্ণার্ত করে তুলেছে।
অনেকে তাই রূপকভাবে বলছেন—
“বাংলাদেশে আবার একটি ঘূর্ণিঝড় আসুক—তবে তা হোক বিবেকের, সংস্কারের, নৈতিকতার ঝড়।”
এই ঝড় যেন আর প্রাণ না নেয়, বরং অবচেতন বিবেককে জাগিয়ে তোলে, যেমন ১৯৭০ সালের ভোলা জাগিয়েছিল রাজনৈতিক চেতনা।
কারণ, প্রকৃতি যেমন অপ্রতিরোধ্য, তেমনি জনগণের চেতনা একবার জেগে উঠলে তাকে দমন করা অসম্ভব।
পরিশেষে: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
১৯৭০-এর ভোলা ঘূর্ণিঝড় শিখিয়েছিল—প্রকৃতি কখনো কখনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে ইতিহাসের হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
আজ, আধুনিক বাংলাদেশের জন্য সেই শিক্ষা আবারও প্রাসঙ্গিক।
দেশের শান্তি, গণতন্ত্র ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য যদি এক নতুন ঘূর্ণিঝড় প্রয়োজন হয়, তবে সেটি মানুষের চেতনায়, বিবেকে এবং নৈতিকতায় বয়ে যাক—
যেন আবারও ধুয়ে যায় অন্যায়, ভণ্ডামি, ও ক্ষমতার দম্ভ,
আর গড়ে ওঠে এক সত্যিকারের স্বাধীন ও শান্ত বাংলাদেশ। জয় বাংলা।








Leave a Reply